1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

ডান্ডাস ফেয়ার

ছেলেবেলায় আমাদের পাড়ায় কলাপাতায় মুড়ে নরম মাখন বিক্রি হতো। অনেকটা শিঙাড়ার মতো ভাঁজ; ভেতরে মোলায়েম মাখন। খিলির মুখটা পাতলা শলা দিয়ে আটকানো। রশিদের দোকানের সাদা গরম পাউরুটির ওপর সেই মাখন ছড়িয়ে ওপরে দানাদার চিনির প্রলেপ, আহ্‌ স্বর্গ নেমে আসত যেন চোখ বুজলেই। তখনো আড়ংয়ের মাখন দোকানগুলোর ফ্রিজে চৌকো হয়ে জমে বসেনি!

বিটিভিতে লিটল হাউজ ইন দ্য প্রেইরি দেখে আমরা যারা বড় হয়েছি তারা ছবিতে দেখেছি লরা ইঙ্গলের মা কীভাবে দুধ থেকে মাখন মন্থন করছেন। কিন্তু সরাসরি দুধ-ননি আলাদা হতে দেখা অথবা দড়ি থেকে জবরদস্ত রশি পাকানো, কিংবা গরুর কাঁধে জোয়াল বেঁধে লাঙল দিয়ে জমি কর্ষানো আক্ষরিক অর্থেই চাক্ষুষ করলাম এই সেদিন।

আমার বরের মুখেই শুনি ডান্ডাস এগ্রিকালচারাল ফেয়ারের কথা। ডান্ডাস। কী খটমট নাম রে বাবা! নামের ব্যাপারে আমার একটু ঝামেলা আছে। নামটা যদি সহজ ঠেকে কানে, আমি আধা চক্ষু মুদে থাকি; দোষ দেখি না সহজে। তা এই ডান্ডাস নামটায় কেমন যেন ‘ডান্ডা’, ‘ডান্ডা’ ভাব; আগ্রহ পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমার বরের অফিসের এক সহকর্মীর ছোট বোনের ঘোড়া এই প্রদর্শনীর কোনো এক ক্যাটাগরিতে লড়বে।

আমার বর তাকে কথা না দিলেও ধারণা দিয়েছেন আমাদের দর্শক সারিতে দেখার সম্ভাবনা আছে। তিন দিন ধরে মেলা। কোন দিন সেই ঘোড়া লড়বে আমার খামখেয়ালি বর ভুলে বসে আছেন। শুক্রবার কাজের দিন। সময় হবে না। রোববার আমরা সেইণ্ট অ্যান্ড্রুস যাচ্ছি, অতএব হাতে রইল এক; শনিবার।

ডান্ডাস জায়গাটা কোথায়? আমার বরের উত্তর, এই তো কাছেই। একটু গুঁতোতেই বোঝা গেল ওর জ্ঞান ওই হোথা! অতঃপর গুগল দিদিই ভরসা। আমার আবার জিপিএসে বিশ্বাস টলমল, গুগল দিদির ঠ্যাকা লাগে। তো জানা গেল জায়গাটা পাশের শহর সুরিতে; পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ড্রাইভ। আর ইন্টারনেটেই দেখলাম এই ভজকট নামের মালিক জর্জ ডান্ডাস ছিলেন প্রিন্স অ্যাডওয়ার্ড আইল্যান্ডের (পিইআই) লেফটেন্যান্ট গভর্নর জেনারেল, ১৮৫৮ থেকে ১৮৬১ পর্যন্ত। জাতে স্কটিশ, চেহারা ছবি ভালোই; হালকা পাতলা কুস্তিগির গোছের না।

অতএব আমাদের যাত্রা হলো শুরু। ঢুকে পড়ি মিল রোডে। এটা দিয়ে ঢুকে ডান দিকে ঘুরলেই ডান্ডাস। কিন্তু রাস্তা এত সুনসান কেন? মেলা মানেই শোরগোল। আমি শান দিই মেজাজে। দিন তারিখ আবার গন্ডগোল করে ফেলেনি তো! না, রাস্তা থেকে ডানদিকে বাঁক নিতেই দেখি পতপত উড়ছে বেলুন। একটু এগিয়েই অস্থায়ী টিকিট কাউন্টার। দুটো। ওখান থেকে আয়তনের ব্যাপ্তি বোঝার উপায় নেই। আট ডলার করে টিকিট, আমরা তিনজন; চব্বিশ ডলার।

চতুর্থ জন মাইন—ক্র্যাফটের কল্প দুনিয়ায় বুঁদ, সঙ্গী হয়নি আমাদের। গাড়ির কাচ নামিয়ে টাকা দেওয়ার সময় ভলান্টিয়ার মেয়েটা এগিয়ে আসে। পিটপিট করে সবার মুখে চোখ বোলায় তারপর এ কান থেকে ও কান হেসে বলে, তোমাদের এই প্রথম? আমি মাথা ওপর নিচ করতে করতে ভাবি বুঝল কি করে? রাস্তা ভুল হয়নি নিশ্চিত, ঢুকুন লেখা তীরচিহ্ন এই দিকই দেখাচ্ছে। তবে? একটু দাঁড়াও! বলে চট করে খুপড়ির ভেতরে ঢুকে যায় মেয়ে, তারপর টিকিটের সঙ্গে গুচ্ছের ফ্লাইয়ার ধরিয়ে দেয়। এরই মধ্যেই ভোজবাজির মতো পেছনে গন্ডা খানেক গাড়ি জমে গেছে লাইনে।

ভেতরে ঢুকেই আমার চক্ষু চড়ক গাছ! বিশাল মাঠ। শেষ নেই যেন। এটা পার্কিং। মেলায় ঢোকার গেট আরও সামনে। সার সার আরভি দাঁড়িয়ে আছে। কেউ পাশেই তাঁবু খাঁটিয়ে আধ কাত হয়ে শুয়ে আছে। কেউ ফোল্ডিং চেয়ার পেতে আয়েশ করে খাওয়া দাওয়া করছে। আর গাড়ি? পিইআই-এর জনসংখ্যার সমানে সমান।

বেশ অনেকটা হেঁটে মূল মেলায় ঢুকলাম। একি! মনে হলো পুরো একটা গ্রাম আমার সামনে। যেন ছবির সেট। ঘোড়ার গাড়ি চলে গেল লোকজন নিয়ে পাশ ঘেঁষে। কান্ট্রি মিউজিক হাওয়া কেটে কানে আসছে। খাওয়া-দাওয়ার স্টল। হাল চাষ হচ্ছে জমিতে এক্কেবারে দেশি কায়দায়; তবে গরুগুলো স্বাস্থ্যে ভরপুর। ছাউনি দেওয়া গ্যালারিতে লোকজন বসে আছে দূরে চোখ মেলে। কাঠের সীমানা প্রাচীরে আধখানা গা বের করে ঝুঁকে আছে কেউ কেউ। কেউ কেউ ছবি তুলছে। তামাশা কি?

এগিয়ে দেখি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সাজুগুজু করা ঘোড়া। এদের লোম ঝুমঝুম রঙের ঔজ্জ্বল্যের প্রতিযোগিতা চলছে। কোন ঘোড়া কত উঁচু তারও প্রতিযোগিতা আছে, এমনকি কে কত কর্মী তারও! ঘুরতে থাকি আমরা। হঠাৎ খেয়াল করি আমরাই একমাত্র রঙের মানুষ, মানে সাদা নই। এতক্ষণে মাজেজা বুঝলাম গেটকিপার মেয়েটার বদান্যতার। ও আমাদের ট্যুরিস্ট ঠাউরেছে!

আছে গরুর, ভেড়া মায় শুয়োরের প্রদর্শনী। কীভাবে ভেড়ার লোম সংগ্রহ করা হয়, কীভাবে ঘোড়ার পায়ে নাল পড়ানো হয়, কীভাবে গরুর দুধ দোয়ানো হয়, সবই চোখের সামনে চলছে। দেখি পাখির খামার। পুরস্কার পাওয়া হাঁস, মুরগি, পায়রা তিতিরের আলাদা ইজ্জত। খাঁচার ওপরে রিবন দেওয়া। লোকজনের, বিশেষ করে বাচ্চাদের ভিড় বেশি ওই খাঁচাগুলোর সামনে। আবার বিক্রিও হচ্ছে হাঁসের ছানা মুরগির ছানা। আস্তাবলের কাছেই শোরগোল বেশি। ফ্ল্যাশলাইটের জন্য কি না জানি না এক তেজি টাট্টু ঘাড় ত্যাড়া করে, নাকের পাটা ফুলিয়ে, পা দাপিয়ে তারস্বরে চিঁহিচিঁহি করেই বকেই চলেছে বিরামহীন।

এতটা হেঁটে গলা কাঠ। ঘরোয়া আইসক্রিমের লাইনে ঢুকি। লম্বা লাইন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফ্লাইইয়ারের পাতা উল্টাই। এবার অবাক হওয়ার পালা আমার। এই মেলার এবার পঁচাত্তর বছর পূর্তি! নিজেকে গাল পাড়ি। খোদ প্রিমিয়ার উদ্বোধন করেছেন। বিশাল জমাটি ছিল আগের দিনের আয়োজন।

ডান্ডাস ফেয়ারের ধারণা শুরু হয়েছিল ১৯৪০ সনে, যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্যের উদ্দেশ্যে। ছোট ডান্ডাস গ্রামের আরও ছোট্ট একটা পাড়ার কিছু অসাধারণ ভালো মানুষের উদ্যোগে। কিন্তু এই মেলা আয়োজনের জন্য দরকার ফাঁকা জমি। তা মিলবে কোথায়? মিটিংয়ে আসা উদ্যোক্তারা মাথা চুলকায়। আর তখনই ত্রাতা হয় বেন্টলি ক্রিড তার নিজস্ব ফাঁকা জমিটা দিয়ে দেয় আয়োজকদের, বিনা বাক্যে।

শুরুতে অর্থাৎ ১৯৪১ সালে এ মেলার মূল আকর্ষণ ছিল ঘোড়া দিয়ে হাল চাষ। চার ক্যাটাগরিতে। ছিল ট্রাক্টর প্লাউয়িং প্রতিযোগিতা। এ ছাড়া একদিনের এই আয়োজনে বিভিন্ন আমোদপ্রমোদের ব্যবস্থা ছিল, ছিল খেলাধুলার প্রতিযোগিতা আর আইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী খাওয়া দাওয়া।

মেলার রকম পাল্টেছে। ব্যাপ্তি বেড়েছে। ১৯৪৪ সালে এই মেলাকে প্রাদেশিক ঐতিহ্যের আওতায় আনা হয়েছে আর ১৯৪৭ সালে এ প্রাদেশিক সরকারের উদ্যোগে প্রায় ৯৯ একর জায়গা কেনা হয়েছে। এতে মেলার কলেবরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বানানো হয়েছে চার হাজার বর্গফুটের কনভেনশন হল। একদিনের মেলা বেড়ে হয়েছে তিন দিন। তবে এখনো মেলার মূল আকর্ষণ সেই ট্রাক্টর প্লাউয়িং আর ঘোড়ার হাল চাষ। যোগ হয়েছে সুন্দরী প্রতিযোগিতা, তবে এই প্রতিযোগিতার বিজয়ী সুন্দরীর চেহারা, মেধার সঙ্গে সঙ্গে জানা চাই ভূমি কর্ষণের ব্যাকরণ-হাতে কলমে।

আমাদের কপাল খারাপ হাল-চাষ প্রতিযোগিতা ও সুন্দরী প্রতিযোগিতা দুই-ই পরের দিন। তাতে কি? ঘুরে ঘুরে হাল চাষ দেখি। দেখি কীভাবে কাঠ টুকরো হতো হাতে চালানো মেশিনে। বিভিন্ন ধরনের ট্রাক্টর! দুধ আর ননি আলাদা হয়ে বেরোয় কীভাবে। তারপর দড়ি পাকানো-এখানে আমার মেয়ে হাত লাগাল খোদ কারিগরের সঙ্গে। বর্ষীয়ান ওয়েন্ডেল জেনকিন্স ভীষণ অমায়িক।

সুতলি থেকে পোক্ত রশি পাকানোর কারিগরি হাতে কলমেই শেখালেন। তার এই দড়ি পাকানোর মেশিন দেড় শ বছরের পুরোনো। এটা তাদের খামার বাড়িতেই আছে এক শ বছরের ওপরে। না, রশি পাকানোর ব্যবসা নেই তাদের। আমার মেয়েকে তিনি বেশ মোটা ভালো দৈর্ঘ্যের রশিই দিলেন। মৃদু স্বরে রসিকতা করলেন, দেয়ালে ঝুলিও, তুমি ঝুলে যেও না যেন!

বাড়িতে ফেরার তাড়া ছিল কাজেই ফিরতে হলো বেলা পড়ার আগেই। তবে ফেরার পথে আমরা একমত আগামী বছর আসছি দেখতে অন্য সব গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে চাক্ষুষ করতে-হাল চাষের প্রতিযোগিতা। ফেরার পথে মনে হলো ডান্ডাস নামটা অত খারাপ না, বেশ সুরেলাই! রঞ্জনা ব্যানার্জী, শারলটটাউন (কানাডা) থেকে তথ্যসূত্র: প্রথমআলো।

More News Of This Category